Tuesday, 25 October 2016

দীপাবলি


"ঘরে ঘরে ডাক পাঠাল —

“ দীপালিকায় জ্বালাও আলো ,

জ্বালাও আলো , আপন আলো ,

সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে । ”

শূন্য এখন ফুলের বাগান ,

দোয়েল কোকিল গাহে না গান ,

কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে ।

যাক্‌ অবসাদ বিষাদ কালো

দীপালিকায় জ্বালাও আলো ,

জ্বালাও আলো , আপন আলো ,

শুনাও আলোর জয়বাণীরে ।"



দীপাবলি বা দেওয়ালি হল একটি পাঁচ দিন-ব্যাপী আলোর উৎসব । আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরাস অথবা ধনত্রয়োদশী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয়। কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয়। নবরাত্রি উৎসব অথবা বাঙালিদের দুর্গোৎসব শেষ হওয়ার ১৮ দিন পর দীপাবলি শুরু হয়। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে, মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বরের মধ্যে দীপাবলি অনুষ্ঠিত হয়।
দীপাবলি ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মরিশাস, গুয়ানা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সুরিনাম, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিজিতে একটি সরকারি ছুটির দিন।

হিন্দু ধর্মে দীপাবলির গুরুত্বঃ- 
হিন্দুদের কাছে, দীপাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিন সব হিন্দুরা বাড়িতে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বাংলা, আসাম ও উড়িশাতে এই দিনটি কালীপূজা হিসেবে উদযাপন করা হয়। ভারতীয় সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস 'দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন' বা 'ন্যায়ের কাছে অন্যায়ের পরাজয়' উক্তি গুলোয়।

 দীপাবলির মাধ্যমে উপনিষদের আজ্ঞায় এইটা চরিতার্থ হয়ে ওঠে, "অসতো মা সৎ গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়। মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়। ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥ ওঁ শান্তিঃ॥..................।" অর্থাৎ "অসৎ হইতে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে অমরত্বে লইয়া যাও। সর্বত্র যেন ছড়াইয়া পড়ুক শান্তির বার্তা।..............।।"

 উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের মতে দীপাবলির দিনেই শ্রীরামচন্দ্র চৌদ্দ বছরের নির্বাসনের পর অযোধ্যা ফেরেন। নিজের পরমপ্রিয় রাজাকে ফিরে পেয়ে অযোধ্যাবাসীরা ঘিয়ের প্রদীপ জ্বেলে সাজিয়ে তোলেন তাঁদের রাজধানীটাকে। এই দিনটিতে পূর্বভারত বাদে সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে লক্ষ্মী-গণেশের পুজোর নিয়ম আছে।

জৈন ধর্মে দীপাবলির গুরুত্বঃ-
  জৈন মতে, ৫২৭ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মহাবীর দীপাবলির দিনেই মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করেছিলেন।

শিখ ধর্মে দীপাবলির গুরুত্বঃ-
১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ ও ৫২ জন রাজপুত্র দীপাবলির দিন মুক্তি পেয়েছিলেন বলে শিখরাও এই উৎসব পালন করেন।

 আর্য সমাজ এই দিনে স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর মৃত্যুদিন পালন করে। তারা এই দিনটি "শারদীয়া নব-শস্যেষ্টি" হিসেবেও পালন করেন।

কালো রাতের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে বর্ণিল আলো। অমানিশার এই আলোকময় রাত ঘিরে আছে লক্ষ্মীর ঐশ্বর্য আর কালীর শক্তিরূপ। এই শক্তি আর ঐশ্বর্যের মায়াজালে দুগ্গা ঠাকুরের জন্য মন কেমন যেন নিমেষে উধাও!
দীপাবলি আর কালীপুজোর রূপ, রস, গন্ধ নিয়ে নিজে তো সাজুনই, পাশাপাশি নতুন উদ্যমে ঘরও সাজান।
দীপাবলি একার উৎসব নয়। অন্তর থেকে অন্দর, অতিথি ভরা এই উৎসবের ক্যানভাসে কেবল রং আর আলোর আলপনা। তাই ঘরও সেজে উঠুক রঙে আর আলোয়। বিশেষ ধরনের কিছু মোম আর রঙিন আবির— এই দুটোকে কাজে লাগিয়ে ঘরে লাগুক আনন্দের ছোঁওয়া।

  দীপাবলি কথাটির অর্থ "প্রদীপের সমষ্টি"। এই দিন সবাই ঘরে ঘরে ছোটো মাটির প্রদীপ জ্বালেন। এই প্রদীপ জ্বালানো অমঙ্গল বিতাড়নের প্রতীক। বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে ঘরে লক্ষ্মী আসেন বলে উত্তর ভারতীয় হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। বাংলার দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই উৎসব সাড়ম্বরে আলোকসজ্জা সহকারে পালিত হয়। তবে এই পূজা প্রাচীন নয়। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে কাশীনাথ রচিত শ্যামাসপর্যাবিধিগ্রন্থে এই পূজার সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকে তাঁর সকল প্রজাকে শাস্তির ভীতিপ্রদর্শন করে কালীপূজা করতে বাধ্য করেন। সেই থেকে নদিয়ায় কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। কৃষ্ণচন্দ্রের পৌত্র ঈশানচন্দ্রও বহু অর্থব্যয় করে কালীপূজার আয়োজন করতেন। অমঙ্গল বিতাড়নের জন্য আতসবাজিও পোড়ানো হয়। বিশেষত উত্তর ভারতে দীপাবলির সময় নতুন পোশাক পড়া, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণের প্রথাও আছে।
ধনতেরাসের দিন অনেক ভারতীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অর্থবর্ষের সূচনা হয়; লোকজন নতুন বর্তন, বাসন, গয়না প্রভৃতিও কিনে থাকেন এই দিনে।( তবে বেশির ভাগ বাঙালি ব্যবসায়ীদের অর্থবর্ষের সূচনা হয় পয়লা বৈশাখে)
 দ্বিতীয় দিনটিকে বলে ভূত চতুর্দশী। এই দিনে বাঙালিরা বাড়ির চোদ্দোটা  কোণায় চোদ্দোটা প্রদীপ জ্বালিয়ে কালো মুছিয়ে আলোকিত করে তুলেন বাড়িটাকে। কথায় আছে যে এমনটা করলে ভূতপ্রেত পরিবার আর স্বজনদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকবে; এমনটাও লোককথায় শোনা যায় যে এই প্রদীপসজ্জার মাধ্যমে পরিবারের পিতৃপুরুষদের অনুষ্ঠানে পদার্পণ করার জন্য নেমন্তন্ন পাঠানো হয়, যাতে ওঁরা মায়ের বাৎসরিক আগমনে উপস্থিত হয়ে সবাইকে শুভাশীশ দিয়ে নিজেরা মায়ের আশীর্ব্বাদে মোক্ষ লাভ করবেন।
 তৃতীয় দিন কার্তিক অমাবস্যায় যেখানে উত্তর ভারতে লক্ষ্মীর পূজা চলছে, পশ্চিমবঙ্গে দারুণ জাঁকজমকে ঘটা করে পালন করা হয় কালীপূজা। অবস্য সেদিন আদি পশ্চিমবঙ্গ বাসিন্দারা, ঘটিরা, বাড়িতে লক্ষ্মীর পূজাও করে থাকেন। তবে আ বাঙালদের, এই নিয়ম নেই; তা অনেকে বাড়িতেও কালী পুজো করেন, যদিও এই পুজোর বারোয়ারি ভাবে পালন হওয়ার প্রচলন বেশি। কদাচিৎ কালীপুজোর দিন আর দেওয়ালির দিন পৃথকও হতে পারে; দেওয়ালির তারিখটা একদিন পরে কিংবা আগেও পড়া সম্ভব। কেননা কালীপূজার লগ্ন অমাবস্যার মাঝরাত্রিতে ঠিক হয়, আবার দীপাবলির লক্ষ্মী পূজার লগ্ন নিশ্চিত করা হয় অমাবস্যার সন্ধ্যেতে, তাই পুজোর লগ্ন অনুযায়ী দুই পুজোর তারিখে মাঝে মাঝে অন্তর ঘটে থাকে। দেওয়ালির দিনে প্রদীপের আলোয় বাড়ি-বাড়ি ঝকমক করে ওঠে। নানান রঙের বাজিতে আকাশটাও রীতিমত চকচক করে থাকে। দীপাবলি সারি-সারি প্রদীপের আলোকে স্বর্গের দেবতাকে মর্তের কুটিরে বরণ করে নেবার উৎসব। চতুর্থ দিন কার্তিক শুক্লা প্রতিপদ। এই দিন বৈষ্ণবেরা গোবর্ধন পূজা করেন। পঞ্চম দিন যমদ্বিতীয়া বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা। এই দিন বোনেরা তাদের ভাইদের জন্যে উপোস করে তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে।


 আমার দীপাবলিঃ-

" দীপ নিবে গেছে মম নিশীথসমীরে, ধীরে ধীরে এসে তুমি যেয়ো না গো ফিরে ॥ এ পথে যখন যাবে আঁধারে চিনিতে পাবে– রজনীগন্ধার গন্ধ ভরেছে মন্দিরে ॥ আমারে পড়িবে মনে কখন সে লাগি প্রহরে প্রহরে আমি গান গেয়ে জাগি । ভয় পাছে শেষ রাতে ঘুম আসে আঁখিপাতে, ক্লান্ত কন্ঠে মোর সুর ফুরায় যদি রে ॥"

আমদের জীবনের সব আলো নিয়ে চিরকালের মতো অমৃতলোকে চলে গেছে  আমাদের প্রান, আমাদের আনন্দ,আমাদের স্বপ্ন,আমাদের একমাত্র অবলম্বন,আমাদের আত্মজা তিতলি। আমরা আমাদের জীবনের শেষ দীপাবলি পালন করেছি গতবছর, বাকী জীবনটা শুধুই অন্ধকার,........................।।এখন যে আলোর দেশে তুই আছিস মা, তোর প্রিয় মেঘ, ছান্দ,তারা,ফুল, পাখি আর প্রজাপতিদের সাথে,......ভালো থাকিস মা ...............।।


" কেমন আছিস্‌ মা?

শেষবারের মত চলে আসার আগে

বড় ইচ্ছে ছিল তোকে দেখার,

ইচ্ছে হচ্ছিল তোর মুখের ওপর

ঝাম্‌রে পড়া চুলগুলো

দুহাতে আল্‌তো সরিয়ে দিয়ে

চুমু খাবার..সেই ছোট্টবেলার মত..

হল না..

দেখা হল না

কথা হল না

একটু ছুঁয়ে দেওয়াও হল না

আর রেখে যাওয়া হল না কিছুই তোর জন্যে..."

                --------------দেবলীনা সেনগুপ্ত


                                                            


 
  আমাদের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে আছে কৃষ্ণকলির আলো৷ বাঙালি মেয়ের কালো রং বড় মধুর–এই মধুরিমা, এই কোমলতা, এই লাবণ্য শুধু বাঙালি মেয়ের গায়ের রঙেই পেয়েছি৷আমি জানি, এদের মধ্যেই বেঁচে আছহে,আমার আত্মজা,আমার মা,আমার সোনা মেয়ে তিতলি, তোদের দিপালিকা হোক .... 'সত্যের পানে৷ তোরা সেই সত্যের আলোকেই জ্বালিয়ে রাখিস আমার দীপাবলি৷ সেই আলোই অন্ধকারে তোদের একমাত্র অবলম্বন৷ ঘরে ঘরে তাই জ্বলে উঠুক সত্য আর মঙ্গলের দীপাবলি! ।
তথ্যসুত্রঃ- গুগল 



 


Friday, 14 October 2016

লক্ষ্মীপূজা

 ·
ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজ-সৃণিভির্ষাম্য-সৌম্যয়োঃ।
পদ্মাসনাস্থাং ধ্যায়েচ্চ শ্রিয়ং ত্রৈলোক্যমাতরম্।।
গৌরবর্ণাং সুরুপাঞ্চ সর্বলঙ্কার-ভূষিতাম্।
রৌক্মপদ্ম-ব্যগ্রকরাং বরদাং দক্ষিণেন তু।।
অর্থঃ দক্ষিণহস্তে পাশ, অক্ষমালা এবং বামহস্তে পদ্ম ও অঙ্কুশধারিণী, পদ্মাসনে উপবিষ্টা, শ্রীরূপা, ত্রিলোকমাতা, গৌরবর্ণা, সুন্দরী, সর্বালঙ্কারভূষিতা, ব্যগ্রহস্তে স্বর্ণপদ্মধারিণী এবং দক্ষিণহস্তে বরদাত্রী দেবীকে ধ্যান করি।

লক্ষ্মী  হলেন ধনসম্পদ, আধ্যাত্মিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী। তিনি বিষ্ণুর পত্নী। তাঁর অপর নাম মহালক্ষ্মী জৈন স্মারকগুলিতেও লক্ষ্মীর ছবি দেখা যায়। লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা।
লক্ষ্মী ছয়টি বিশেষ গুণের দেবী। তিনি বিষ্ণুর শক্তিরও উৎস। বিষ্ণু রাম ও কৃষ্ণ রূপে অবতার গ্রহণ করলে, লক্ষ্মী সীতা ও রাধা রূপে তাঁদের সঙ্গিনী হন। কৃষ্ণের দুই স্ত্রী রুক্মিনী ও সত্যভামাও লক্ষ্মীর অবতার রূপে কল্পিতা হন।
লক্ষ্মীর পূজা অধিকাংশ হিন্দুর গৃহেই অনুষ্ঠিত হয়। দীপাবলি ও কোজাগরী পূর্ণিমার দিন তাঁর বিশেষ পূজা হয়। বাঙালি হিন্দুরা প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপূজা করে থাকেন।পারিবারিক রীতি অনুযায়ী , লক্ষীদেবী ,কোথাও মূর্তি,কোথাও শস্যপূর্ণ ঘট,বা কোথাও নবপত্রিকা রূপে পূজিতা হন ।
দেবী লক্ষ্মী হলেন ধন সম্পদের দেবী। আদিশক্তির রাজসিক স্বরূপ । অগ্নি পুরাণ মতে শ্রী বা লক্ষ্মী হলেন যজ্ঞবিদ্যা , তিনিই আত্ম্যবিদ্যা , যাবতীয় গুহ্যবিদ্যা ও মহাবিদ্যা ও তিনি –‘যজ্ঞবিদ্যা মহাবিদ্যা গুহ্যবিদ্যা চ শোভনা ।আত্ম্যবিদ্যা চ দেবি বিমুক্তিফলদায়িনী ।।’ দেবী ভাগবত মতে যে স্বর্গে তিনিই স্বর্গ লক্ষ্মী , রাজগৃহে তিনি রাজলক্ষ্মী , গৃহে তিনি গৃহলক্ষ্মী । তিনি শান্তা , দান্তা , সুশীলা , সর্ব মঙ্গলা , ষড়রিপু বর্জিতা ।
পুরানে আছে সাগর মন্থন কালে দেবী লক্ষ্মী সমুদ্র থেকে প্রকট হন । সাগর হল লক্ষ্মী দেবীর পিতা । সাগরেই মুক্তা , প্রবাল আদি রত্ন পাওয়া যায় । রত্ন হল ধন , যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন লক্ষ্মী । এই হল দেবী লক্ষ্মীর সামগ্রিক স্বরূপ । দশ মহাবিদ্যার দশম মহাবিদ্যা কমলা দেবী হলেন মা লক্ষ্মী। স্বতন্ত্র তন্ত্র নামকএক তন্ত্র শাস্ত্র মতে কোলাসুর নামক এক অসুরকে বধ করার জন্যই দেবী কমলার আবির্ভাব । বারাহী তন্ত্র মতে পুরাকালে প্রজাপতি ব্রহ্মা, ভগবান বিষ্ণু, ভগবান শিব এই কমলা দেবীকে পূজা করেন বলে কমলা মায়ের এক নাম ‘ত্রিপুরা’ ।
মা লক্ষ্মী কমল আসনে থাকেন। কমল হল সর্বাত্মক বিকাশের প্রতীক ।
এমন কথিত আছে মা লক্ষ্মী পদ্মা নদী রূপে বঙ্গদেশে প্রবাহিতা আবার গঙ্গা , গোদাবরী , কৃষ্ণা , সিন্ধু রুপে ইত্যাদি ভারতের বিভিন্ন নদির অববাহিকাতে শশ্য শ্যামলা করে তুলেছেন । তার জলে বঙ্গদেশ ও ভারতবর্ষের মৃত্তিকা হয়েছে উর্বরা , শস্যে ভরা । তিনি কৃষিজ লক্ষ্মী। লাঙ্গল কর্ষণ কালে লক্ষ্মী অবতার সীতা মায়ের আবির্ভাব । লাঙ্গল দিয়ে জমিতে হাল বয়ে জমি উর্বরা করে চাষাবাদ করলেই মাঠ ভরে উঠবে সোনালী ধানে। এদিক থেকে তিনি কৃষি লক্ষ্মী। তাই ভাদ্র মাসে,পৌষ মাসে কৃষি লক্মী পূজা হয় প্রায় ঘরে। খনিজ লক্ষ্মী বলে সোনার দ্রব্য বোঝায়। সোনাকে আমরা মা লক্ষ্মীর সাথে তুলনা দিয়ে থাকি। ঐশ্বর্যের আর এক উৎস সমুদ্র। পুরান বলে সাগর মন্থন কালেই দেবী বিষ্ণুপ্রিয়ার আবির্ভাব। সাগরে ডুব দিয়ে প্রবাল, শঙ্খ, কড়ি আদি রত্ন সামগ্রী পাওয়া যায়। বানিজ্য করতেও দেখা যায় এই দেবীর আশীর্বাদের প্রসঙ্গ। নববর্ষে দোকানে ব্যবসায়ী গণ গণেশের সহিত মা লক্ষ্মীর পূজো করেন । এছাড়া লক্ষ্মী পূজোতে কলা গাছের কান্ড দিয়ে নৌকা বানিয়ে পূজোতে দেওয়া হয়, তা বানিজ্য ও লক্ষ্মী ঘরে আনারই প্রতীক। শ্রী রামচন্দ্র সীতা মাতা উদ্ধারের জন্য বা রাজা সুরথ রাজ্য উদ্ধারের জন্য এই মহালক্ষ্মী স্বরূপা দুর্গা দেবীর পূজা করেছিলেন। এই ভাবে লক্ষ্মী দেবীর একটি রূপ আমাদের সামনে ফুটে ওঠে ।
কোজাগোরী পূর্ণিমা বা শারদ পূর্ণিমাতে আমরা মা লক্ষ্মীর পূজো করি, যদিও দীপাবলি তেই সমগ্র দেশে পূজিতা হন। পূর্ণিমার চাঁদের আলো যখন দিগ দিগন্তে সন্ধ্যার কালো আঁধার কাটিয়ে আলোর ছটা ছড়িয়ে পড়ে, তখন উলু, শঙ্খ ধ্বনি সহকারে আমরা মা লক্ষ্মীর পূজার্চনা করি। এমন বলা হয়, দেবী জেগে খবর নেন- কে জেগে আছে –
নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ জাগরত্তীতিভাষিণী ।
তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈঃ ক্রীড়াং করোতি যঃ ।।
কো জাগর্ত্তি – কে জেগে আছে ? কোজাগোরী শব্দের অর্থ এমন টাই । মা দ্বারে দ্বারে আশিষ দিয়ে যান, যে জেগে থাকে সে পায় আশিষ, কিন্তু যে ঘুমায় সে ঘুমিয়েই থাকে । আর অক্ষ ক্রীড়া মানে কিন্তু জুয়া খেলা নয়। ‘অক্ষ’ শব্দের অনেক প্রকার মানে হয় । এর মানে হয় ‘ক্রয় বিক্রয় চিন্তা’। বৈশ্য গণ এদিন জেগে ব্যবসা বানিজ্য করে ঘরে লক্ষ্মী আনার চিন্তা করেন। অক্ষ শব্দের আর এক মানে হয় জপ মালা। যারা সত্ত্ব গুনের তারা এই রাত্রি মায়ের নাম জপ করেই কাটাবেন। কো জাগর্ত্তি শব্দ তাদের কাছে আত্ম চৈতন্যের বানী। দেবীর বাহন হলেন পেঁচক। পেঁচক দিনে ঘুমায় রাতে জাগে। সাধারন মানুষ যখন ঘুমায়, পেঁচক জাগে। এ ঠিক যোগীর অবস্থা। সাধারন মানুষ যখন নিদ্রামগ্ন, যোগী তখন যোগ সাধনায়। পেঁচক ইঁদুর ভক্ষণ করে কৃষকের শস্য রক্ষা করে। এদিক থেকে এই প্রানীটি সত্যই আমাদের কাছে মা লক্ষ্মীর বার্তা, ভাব বয়ে আনে ।
ব্রতকথা
লক্ষ্মীকে নিয়ে বাংলার জনসমাজে বিভিন্ন জনপ্রিয় গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্পগুলি পাঁচালির আকারে লক্ষ্মীপূজার দিন পাঠ করা হয়। লক্ষ্মীর ব্রতকথাগুলির মধ্যে "বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা" সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়াও "বারোমাসের পাঁচালি"-তেও লক্ষ্মীকে নিয়ে অনেক লৌকিক গল্পের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা
পেচকবাহিনী লক্ষ্মী
বাঙালি হিন্দুরা প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর সাপ্তাহিক পূজা করে থাকেন। এই পূজা সাধারণত বাড়ির সধবা স্ত্রীলোকেরাই করে থাকেন। "বৃহস্পতিবারের ব্রতকথা"-য় এই বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীব্রত ও পূজা প্রচলন সম্পর্কে একটি যে লৌকিক গল্পটি রয়েছে, তা এইরকম: এক দোলপূর্ণিমার রাতে নারদ বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মী ও নারায়ণের কাছে গিয়ে মর্ত্যের অধিবাসীদের নানা দুঃখকষ্টের কথা বললেন। লক্ষ্মী মানুষের নিজেদের কুকর্মের ফলকেই এই সব দুঃখের কারণ বলে চিহ্নিত করলেন।. কিন্তু নারদের অনুরোধে মানুষের দুঃখকষ্ট ঘোচাতে তিনি মর্ত্যলোকে লক্ষ্মীব্রত প্রচার করতে এলেন। অবন্তী নগরে ধনেশ্বর নামে এক ধনী বণিক বাস করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলেদের মধ্যে বিষয়সম্পত্তি ও অন্যান্য ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া চলছিল। ধনেশ্বরের বিধবা পত্নী সেই ঝগড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে বনে আত্মহত্যা করতে এসেছিলেন। লক্ষ্মী তাঁকে লক্ষ্মীব্রত করার উপদেশ দিয়ে ফেরত পাঠালেন। ধনেশ্বরের স্ত্রী নিজের পুত্রবধূদের দিয়ে লক্ষ্মীব্রত করাতেই তাঁদের সংসারের সব দুঃখ ঘুচে গেল। ফলে লক্ষ্মীব্রতের কথা অবন্তী নগরে প্রচারিত হয়ে গেল। একদিন অবন্তীর সধবারা লক্ষ্মীপূজা করছেন, এমন সময় শ্রীনগরের এক যুবক বণিক এসে তাদের ব্রতকে ব্যঙ্গ করল। ফলে লক্ষ্মী তার উপর কুপিত হলেন। সেও সমস্ত ধনসম্পত্তি হারিয়ে অবন্তী নগরে ভিক্ষা করতে লাগল। তারপর একদিন সধবাদের লক্ষ্মীপূজা করতে দেখে সে অনুতপ্ত হয়ে লক্ষ্মীর কাছে ক্ষমা চাইল। লক্ষ্মী তাকে ক্ষমা করে তার সব ধনসম্পত্তি ফিরিয়ে দিলেন। এইভাবে সমাজে লক্ষ্মীব্রত প্রচলিত হল।
তথ্য-সুত্র ঃ- "Lakshmi: Goddess of Wealth & Beauty!"
Encyclopaedia of Hindu Gods and Goddesses
"Radha - Goddess Radha, Sri Radharani, Radha-Krishna, Radhika"
Radha in Hinduism, the favourite mistress of the god Krishna, and an incarnation of Lakshmi. In devotional religion she represents the longing of the human soul for God: The Oxford Dictionary of Phrase and Fable (2006); Elizabeth Knowles |
"শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা ও পাঁচালী", মেয়েদের ব্রতকথা, কালীকিশোর বিদ্যাবিনোদ সম্পাদিত,
ফটো ঃ- এই সময় সৌজন্যে